হুমায়ুন আহমেদকে নিয়ে লিখতে বসেই আমার
আশেপাশের পাবলিক লাইব্রেরীগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। সেখানে অবাক হয়ে দেখি হুমায়ুন
আহমেদের কোন বইয়েরই শারীরিক অবস্থা ভাল নেই! তাঁর বইয়ের উপর দিয়ে এত ধকল গিয়েছে
যে, ২০ পৃষ্ঠার পর দেখা যায় ৩৬, ৪০ এর পর ৫৬….......!
লাইব্রেরীর পাঠকদের হুমায়ুন আহমেদ -এর
ব্যপারে কিছু জিজ্ঞেস করলে তাঁর বিষয়ে তারা এমন সব বর্ণনা দেন…মনে হয় তারা সবাই যেন তাঁকে নিয়ে রীতিমত গবেষণা করে
ফেলেছে! তাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা হুমায়ুন আহমেদ লেখেন বলে তারা পাঠক। পক্ষান্তরে বাংলা সাহিত্যের অনেক বড় বড় লেখকের
বই গুলো এত ভাল আছে যে, অনেক বছর ধরে লাইব্রেরীতে থাকার পরও বইয়ের দোকানে ওগুলো
রেখে দিলে- অনায়াসে নতুন বই পরিচয় নিয়ে বিক্রি হয়ে যাবে।
দিনাজপুরের প্রত্যন্ত একটি এলাকায় বসে
প্রত্যন্ত এলাকার লাইব্রেরী গুলোর কথা এতক্ষণ বললাম। আমি জানি যে, যেখানে আমি বসে
আছি সেখানে বসে ‘হুমায়ুন’-এর ব্যপারে চূড়ান্ত মীমাংসায় যাওয়া বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়।
তবে যেখানে বসে আছি…ইন্টারনেটের বদৌলতে সেখানে বসেই, দেশে ‘একজন হুমায়ুনের’ প্রভাব কতটা
সুদূর প্রসারী তা সহজেই আচ করতে পারি।
তাঁর সম্পর্কে যতটুকু পড়েছি-যতটুকু জেনেছি...শুধু
একটা কথাই বলতে পারি, সাহিত্যাকাশে হুমায়ুন নক্ষত্রের যে দীপ্তি তা অন্য যেকোন
লেখিয়ের মনে হিংসার উদ্রেক করার জন্য যথেষ্ট। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে সেই নক্ষত্র
কোন আকাশে জ্বলছে? সেটা কি ‘পৃথিবী একটি
থালার মতো অনেকগুলো হাতি এ থালা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে’- এমনটা যারা
ভাবছে তাদের আকাশ, নাকি যারা ’যান নিয়ে কত
জোরে গেলে পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ ভেদ করা যাবে সেই ভাবনায় মত্ত তাদের আকাশ?
এখানে একদল যখন তাঁর উপন্যাসকে ‘অপন্যাস’ বলছে আরেকদল
তখন তাঁর বাড়ির সামনে গিয়ে তাঁরই সৃষ্ট কাল্পনিক চরিত্রের ফাঁসির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ
করছে।
মনে অনেক প্রশ্ন জাগে…একজন লেখকের লেখার মান কে/কারা বিচার করবে?
কয়েকজন ‘মহাজ্ঞানী’ নাকি কয়েক
লক্ষ্য পাঠক?
কেউ তাঁকে বাংলা সাহিত্যের সিংহাসনে দেখে - দেখতে পান বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার এক যুগ। অন্য লেখকরা
নাকি তাঁর জন্য গড়ে উঠছে না। এর জন্য তারা হুমায়ুন আহমেদকে অনেকাংশেই
দায়ী করেন। তাদের মতে অনেক সুস্থ পাঠককে তিনি আটকে দিচ্ছেন গাঁজার নেশার মতো করে, পাঠকের হাত ধরে গড়ে উঠতে পারে এমন সম্ভাবনাময় অনেক লেখকের বেড়ে ওঠাকে তিনি প্রতিহত করছেন।
কোন লেখকের সমালোচনা করার সময় সমালোচকদের একটা কথা মাথায় রাখা উচিৎ সেটা
হল, কোন কোন শ্রেণীর পাঠক সেই লেখকের ভক্ত। এদের
মধ্যে বুদ্ধিজীবী আর বুদ্ধিহীণদের অনুপাতটা কেমন? যেটা পছন্দ হচ্ছেনা সেটা খারাপ বলাটা সমালোচনা নয়,
নিন্দা। একজন লেখকের লেখার
মান নিয়ে নিন্দা করা অর্থ তাঁর ভক্ত পাঠকদের পছন্দ,
রুচিবোধ, বিচার-বুদ্ধিকে প্রশ্ন বিদ্ধ করা।
আপনাকে ‘হুমায়ুন’ ভাল লাগে না তাই তাঁর
সময়টাকে আপনি ‘অন্ধকার যুগ’ বলে ঘোষণা দেবেন, খামখেয়ালী - জীবন সম্পর্কে উদাসীন আপনি
তাঁর ‘হিমু’ কে ‘মাস্টারপিস’ ভাববেন এমনটা হতে পারে না।
সাহিত্যাকাশে নক্ষত্ররুপী একজন লেখক
কতযুগ ধরে জ্বলবেন তা নিয়ে ভবিষ্যদানী করা নিজেকে গড হিসেবে জাহির করার বৃথা
চেষ্টার নামান্তর ছাড়া আর কিছুই নয়।
এতক্ষণ যাঁরা আমার এ লেখা পড়লেন তাঁরা
নিশ্চয়ই হুমায়ুন আহমেদের প্রতি আমার সুক্ষ (অথবা স্থুল) পক্ষপাতিতা লক্ষ্য করেছেন।
মিথ্যে বলা হবে যদি বলি তাঁর ‘ভক্তপাঠক’ কূলের লিস্টে আমার নাম কখনোই ছিল না।
একটা সময় ছিল যখন জীবন সম্পর্কে হতাশ এই
প্রদীপ তাঁর ‘মেঘ বলেছে যাবো যাবো’ -তে ‘হাসান’ চরিত্রটির মাঝে নিজেকে খুঁজে পেত। ‘নন্দিত
নরকে’-র পারিবারিক সমস্যার কাছে যার পারিবারিক সমস্যা ম্লান হয়ে যেত। ‘হিমু’-র
অযৌক্তিক কথাবার্তা, অস্বাভাবিক জীবনযাপন দেখে মুখে হাসি ফুটিয়ে যে বেঁচে থাকার
আনন্দ খুঁজে নিত।
একটা সময় ছিল যখন এই প্রদীপ ‘মিসির আলি’-কে
অভিভাবক জ্ঞান করত।
কিন্তু আজ এ প্রদীপ মনে হয় অকৃতজ্ঞ হয়ে
গেছে। আজ হিমুর ‘হিউমারে’ সে আর কোন ‘সেন্স’ খুঁজে পায় না। ‘হিমু এবং হার্ভাড
পিএইচডি বোলটু ভাই’, ‘হিমু এবং একটি রাশিয়ান পরি’ এসব পড়ে যারপরনাই বিরক্ত - ওগুলো
ছিঁড়ে না ফেললে যেন তার স্বস্তি নেই। ‘অভিভাবকের’
লিস্টে ‘মিসির আলি’ যেন শুধু একটি ‘পুর্বসূরির’ নাম….!
আজ ‘হুমায়ুন সাহিত্যের’ দিকে তাকালে মনে
হয় সেখানে শুধু হাহাকার ছাড়া যেন আর কিছু নেই। সেখানে ‘The Inheritance of Loss’, ‘The
God of Small things’, ‘The Old Man and the Sea’-র মত উপন্যাসের হাহাকার। মনে
প্রশ্ন জাগে কেন তিনি এরকম great উপন্যাস লিখলেন না? মনে আপসোস জাগায় সেই বিশ্বাস
যে এরকম উপন্যাস লেখার ক্ষমতা তাঁর সবসময়ই ছিল।
[June 24, 2012]

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন