গত ইন্ডিয়া –পাকিস্থান
ম্যাচ নিয়ে ফেইসবুকে অনেক বিতর্কিত পোষ্ট দেখলাম….।
নানা রকম পোষ্ট,
“ইন্ডিয়া আমাদের এ দেয় না সে দেয় না, পাকিস্থান আমাদের সাথে এ করেছে সে
করেছে তবু আমরা নির্লজ্জের মত তাদের সমর্থন
দিয়ে যাচ্ছি...”
বিতর্কের বিষয়গুলো
নতুন নয়- অনেক পুরনো। দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদ নিয়ে বিতর্ক!
তাদের অভিযোগ
গুলোও মিথ্যে নয় –ভয়াবহ সত্যি।
একজন লিখেছে, ‘যাদের
ইন্ডিয়া জিতছে, দয়া করে তারা
ইন্ডিয়া গিয়া নাচেন। আর যাদের পাকিস্তান হারছে, তারা দয়া করে পাকিস্তান গিয়া কান্দেন!
বাংলাদেশটারে
আপনাগো মত রামছাগলের হাত থেকে অন্তত রক্ষা করেন’!
আরেকজন লিখেছে,
‘দশটা টেস্ট প্লেয়িং দেশের মধ্যে একমাত্র দেশ ইন্ডিয়া যারা আমাদের কখনো
তাঁদের দেশে খেলতে আমন্ত্রণ জানায় নি, এর পরেও যারা ইন্ডিয়াকে সাপোর্ট করে তাঁরা
কি দেশের ভালো চায়’।
গত সাত -আট বছরে ইন্ডিয়াতে
অনুষ্ঠিত ম্যাচ গুলোর পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখলে দেখা যায় সবগুলো
বড় দলের (including Australia) যারাই ইন্ডিয়াতে খেলতে এসেছে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে তাঁরা সবাই গোহারা হেরে
বাড়ি ফিরেছে। আর ক্রিকেটটা ইন্ডিয়াতে খেলার সাথে বাণিজ্যও বটে। বড়রাই যেখানে পাত্তা
পায় না সেখানে বাংলাদেশ
আরো খারাপ করবে, এতে ম্যাচ গুলো জমবে না -দর্শক মাঠে আসবে
না, BCCI আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে আর নিজেদের ক্ষতি করে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো... ইন্ডিয়ানদের কাছে এতবড় ‘বিদেশ প্রেম’ আশা করা… একটু বেশী হয়ে যাচ্ছে না…। “ওরা
আমাদের পানি দেয় না, সীমান্তে আমার দেশের লোকজনদের বর্বরের মত গুলি করে
মারে -তবু
শালা ওদের সমর্থন করিস”
-ইন্ডিয়া ক্রিকেট সমর্থকদের উপর যারা এমন উত্তপ্ত বাক্য নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের
বলতে চাই, শচীন
-শেবাগের শৈল্পিক ব্যাটিংয়ে ওরা শুধু মুগ্ধ হতে জানে, পানি না দেয়া -গুলি করা এতে শচীন- শেবাগদের কোন হাত নেই এ ব্যপারেও তাঁরা খুব সম্ভবত নিশ্চিত। কিন্তু হ্যাঁ, BAN vs IND তে খেলা হচ্ছে তখন যদি বাংলাদেশের কেউ প্রার্থণায়
বসে বলে, “ওহঃ God শচীনের
উইকেটটা আগলে রেখো” -তখন তার গালে জুতা দিয়ে কষে চড় মারা উচিত্ (হাত দিয়ে মারলে হাত নোংরা হবে)। As a fan শচীনের
জন্য প্রার্থনা করার অধিকার তার আছে কিন্তু নিজের দেশের প্রতি আবেগ –ভালবাসা
বিসর্জন দিয়ে, ভুলে গিয়ে নয়।
“আমাদের বাংলায় কথা বলার অধিকারটুকু কেঁড়ে নিতে চেয়েছিল, ’৭১ -এ আমাদের
উপর অমানুষের মত হত্যাকান্ড চালিয়েছে…” – সেই ছোট বেলা
থেকেই পাকিস্থান নামটা সবসময় শুধু এরকম রক্তগরম করা বাক্যগুলোর
সাথেই খুঁজে পাই।
বাংলাদেশকে
কেন্দ্র করে পাকিস্থান নামটির সাথে সম্পর্কিত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে… ওতে বাংলায়
কথা বলা, বাংলাদেশে জন্ম নেয়া যে কোন বাংলাদেশী-ই রক্ত গরম হওয়ার মত যথেষ্ট উপাত্ত
খুঁজে পাবে ( এর জন্য ‘আবুল হোসেনের মত মস্ত দেশপ্রেমিক’ হতে হবে না)।
শুধুমাত্র
ক্রিকেট নিয়ে কথা বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু এর বহির্ভূত বিষয়গুলোও এসে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের উপর
পাকিস্থানীদের বর্বরোচিত আচরণ বুঝার জন্য বাংলাদেশী হতে হবে না। পাকিস্থানীদের
কর্মকান্ড যে মোটেও ‘মানুষের মত’ ছিল না, অনুভূতি
সম্পন্ন পৃথিবীর যে কোন শান্তিকামী মানুষই এই কথা একবাক্যে মেনে নেবে।
এই যে একটা জাতির মহাকলঙ্কজনক একটা পরিচয়
এর পেছনের গল্পটা পাকিস্থানীদের প্রতি আমার মনে শুধু সহানুভুতি-ই জাগাচ্ছে।
“যার নির্দেশে বাংলাদেশে হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছিল সেই
ইয়াহিয়া খান
ছিল সামরিক শাসক, তৎকালীন উর্দু ভাষী খাঁটি পাকিস্থানীদের নির্বাচিত কেউ নয়। এই যে
তোমরা ’৭১ –এর বিভীষিকার জন্য সমস্ত পাকিস্থানী জাতিকে ধিক্কার জানাচ্ছ, কীভাবে প্রমাণ
করবে সেই সময়ের ‘ইয়াহিয়া কান্ডে’ সমস্ত পাকিস্তান জাতির সমর্থন ছিল।” – একজন খাঁটি
পাকিস্থানী যদি কোন বাংলাদেশীকে এই প্রশ্ন করে এর উত্তরে কী বলা যায়?
- আমার অন্তত এ প্রশ্নের উত্তর জানা নেই!
যতদিন বাংলাদেশ
থাকবে, ষোল’শ কিঃ মিঃ দূরের ওই জাতিটির প্রতি বাংলাদেশীদের শুধু ঘৃণাই বর্ষিত হবে,
ইতিহাসে লেখা থাকবে “পাকিস্তানীরা বাংলাদেশীদের অমানুষের
মত হত্যা করেছে”। একটা পুরো জাতিকে আজীবন এই কলঙ্ক নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে।
জনৈক ওই
পাকিস্থানীর প্রশ্নের যতার্থ উত্তর না দিতে পেরে একজন বাংলাদেশীর মনে তাদের প্রতি
যদি সহানুভূতির জন্ম নেয় এটা কি খুব unnatural মনে হবে?
ক্রিকেট নিয়ে
শুরু করেছিলাম, আবার ক্রিকেটে ফিরে যাই। আফ্রিদির ছক্কা মারার বিশেষ ক্ষমতা, আজমলের
দুসরা দেয়ার ক্ষমতাতে মুগ্ধ হয়ে কোন বাংলাদেশী যদি তাঁদের ফ্যান বনে যায়, সেই
বাংলাদেশীর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা কি খুবই যৌক্তিক দেখাবে…?
ওদের পূর্বসূরিদের
দায় কেন ওদের উপর বর্তাবে? ওদের প্রতিভার যথাযথ মূল্যায়ন বাংলাদেশীদের কাছে কেন
ওরা আশা করবে না?
নাহ… অনেক হয়েছে,
বিতর্কিত বিষয়গুলো থাক -এবার শুধুই ক্রিকেট নিয়ে কথা বলবো।
ক্রিকেট
বাংলাদেশের জন্য সত্যি-ই আশীর্বাদ হয়ে এসেছে।
ভাগ্যিস
ক্রিকেট আছে, নয়তো পুরো জাতি আমরা এক হতাম কী করে? শুধুমাত্র ক্রিকেটকে কেন্দ্র
করে আমরা পুরো জাতি ধর্মীয় ভেদাভেদ –সাম্প্রদায়িকতা ভুলে সবাই একসাথে দোয়া
চাই –প্রার্থনা করি বাংলাদেশের জন্য, God –ঈশ্বর -আল্লাহ’র কাছে।
আমরা যে আমাদের
এই দেশটাকে খুব খুব খুব ভালবাসি এটা উপলব্দি করতেও
ক্রিকেট অনেক সাহায্য করে। ফিরে যাও গত ২২ মার্চ –এর সেই রাতটিতে,
যেদিন বাংলাদেশ মাত্র দুই রানের জন্য এশিয়া কাপ মিস করলো। তেমন কিছু তো নয়, আমরা
যারা ভালমত খেতে পাই না ওই কাপ জিতলে অবশ্যই সেই সমস্যার সমাধান হয়ে যেত না।
তবুও কেন এত
কষ্ট পেয়েছিলাম? কষ্ট পেয়েছিলাম, কারণ আমরা জানতাম বাংলাদেশ ওই কাপ জিতলে ওটা গোটা
দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রেষ্ঠত্বের স্মারক হয়ে উঠতো।
আসলে আমরা সবাই
আমাদের এই সোনার দেশটাকে খুব ভালবাসি।
বাংলাতে কথা
বলি, বাংলাতে হাসি- কাঁদি –ভাবি, বাংলাকে –বাংলাদেশকে ভাল
না বেসে আর উপায় কই আমাদের?
দেশের প্রতি
আমাদের এই যে গভীর ভালবাসা এটা খুব সম্ভবত আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি থেকে আসে,
এর জন্য
মহাত্মা গান্ধী (The great soul) হতে হয় না।
[October 2, 2012]
